রানি বিষণকুমারী দেবী ও তার রাজপাট
By অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় • Jan 03, 2026
একসময় কালনা বর্ধমান রাজাদের প্রধান প্রশাসনিক দপ্তর রুপে পরিচিত হয়েছিল। ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সাথে বোঝাপড়ায় সমস্ত রাজ কার্য বর্তমান কালনার রাজবাড়ী চত্বর থেকেই পরিচালিত হচ্ছিল। এখন প্রশ্ন হল কি এমন হয়েছিল যার জন্য ভাগীরথী তীরস্থ একটা বন্দর এতটা গুরুত্ব পায়? এরজন্য আমাদের মহারাজ তিলোকচাঁদের সময়ে যেতে হবে। ১৭৪৪ থেকে ১৭৭০ সাল পর্যন্ত মহারাজ তিলোকচাঁদ বর্ধমানের রাজা ছিলেন। সে সময় একটা অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সারা বাংলা অতিবাহিত করছিল। মন্বন্তরের বছর ১৭৭০ সালে যখন তিলোকচাঁদ মারা গেলেন তখন তাঁর সন্তান তেজচাঁদ মাত্র ৬ বছরের শিশু। তিলোকচাঁদের দ্বিতীয়া স্ত্রী মহারাণী বিষণকুমারী ছেলের হয়ে সমস্ত রাজকার্য পরিচালনার দায়িত্ব নেন।
বর্ধমান তখন একটি বর্ধিষ্ণু জমিদারী. রাজকোষ পরিপূর্ণ। এখবর ইষ্টইন্ডিয়া
কোম্পানীর ওপরমহলের কর্মচারীরা বিলক্ষণ জানেন। আবার এর দায়িত্বে একজন বিধবা রাজমাতা তাই যেনতেন প্রকারেন বর্ধমানের রাজকোষের ওপর দৃষ্টি পড়লো স্বয়ং ওয়ারেন হেস্টিংস এর। সে অবস্থায় বিষনকুমারী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে একদিকে রাজকোষ অন্যদিকে রাজ্যপাট ইংরেজদের ললুপ দৃষ্টি থেকে বাঁচান ।কিন্তু তারমধ্যেও ১১ লক্ষ টাকা ইংরেজ এবং তার সহযোগীরা আত্মসাৎ করে নেয়। ১৭৭৯ সাল পর্যন্ত বিষণকুমারী ঝড়ঝঞ্ঝা সহ্য করেও রাজ্যপাট টিকিয়ে রাখেন। পুত্র তেজচন্দ্র তখন ১৪ বছরের, তাঁর হাতে রাণীমা বিষণকুমারী বর্ধমানের রাজতন্ত্র সমর্পন করেন। অসাধারণ বুদ্ধিমতি এই রাণী রাজ্যের ৭৫ টি পরগণা থেকে বার্ষিক ৪০ থেকে ৪৩ লক্ষটাকা রাজস্ব আদায় করেছেন নিয়মিত। ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানীর কাছে বাকী থাকে নি কখনও। তাঁর আগ্রহেই কালনায় হয়েছে দুটি শিব মন্দির। একটি ১৭৬৪ সালে রূপেশ্বর শিবমন্দিরের পূর্ব দিকে, অন্যটি ১৭৮৪ সালে শ্রী শ্রী রামেশ্বর শিব মন্দির।
১৭৭৯ সালে মহারাজ তেজচন্দ্র রাজা হলেন বটে কিন্তু ছোটো থেকেই ছিলেন বিলাস প্রিয়, কুসংসর্গে থাকার কারণে আমোদ প্রমোদে বহু টাকা নয়ছয় করতে থাকেন। ১৭৮৩ খাজনা বাকী পড়লো ৩ লক্ষ ৩ হাজার ১৭৫ টাকা । ইংরেজ পরিচালিত বোর্ডও রাজাকে রাজকার্যে মনোযোগী হতে নির্দেশ করেন। ১৭৮৯ সালের মধ্যে তেজচন্দ্র ঠিকঠাক রাজস্ব দিতে না পারায় দুবার গৃহবন্দী হন এবং জরিমানাও দেন। একের পর এক অঞ্চল রাজার হাতছাড়া হতে থাকে। তবু উচ্ছৃঙ্খলতা রাজার কমলো না, ৮ জন পত্নী ছিল তেজচন্দ্রের এছাড়া একজন বিদেশীনী রক্ষিতাও ছিল তাঁর। রাণীমা বিষণ কুমারী ছেলের এই জীবনযাত্রায় খুবই বিরক্ত ছিলেন । ছেলে নাবালক থাকার সময় এই রাজত্বই তিনি যথেষ্ট দক্ষতার সাথেই চালিয়েছিলেন । তাই বেদনা সব থেকে তাঁরই হচ্ছিল। কিন্তু মায়ের পরামর্শ কানেও নিতেন না তেজচন্দ্র । বেশ কয়েকবার গণ্ডগোলও হয়। এদিকে ১৭৯৩ সালে রাজ্যের নিয়ম শাসন ভার কোম্পানীর নতুন পুলিশ আধিকারিকরা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় ফলে রাজা প্রকৃতপক্ষে সব ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত হলেন। ১৭৯৪ সালের ১০ই জানুয়ারী বর্ধমানের কালেক্টার সাহেব ঘোষণা করলেন একমাত্র রাণী বিষণকুমারী যদি দায়িত্ব নেন তবে রাজ্যপাট থাকবে নচেৎ পুরোটাই কেড়ে নেওয়া হবে। অবশ্য এর মধ্যে অনাদায়ী সব রাজস্ব পরিশোধ করতে হবে। শুধু তাই নয় তেজচন্দ্রকে বর্ধমানে না থাকারও নির্দেশ জারী হয়। এদিকে বিষণকুমারী ছেলের অত্যাচারে তখন কালনায় এসে থাকছেন। বাকী জীবনটা ধর্ম ও কৃষ্ণ সেবা করেই কাটাবেন একপ্রকার স্থিরও করেছিলেন । কিন্তু কালেক্টার সাহেব যখন স্বয়ং কালনায় এসে সরকারী নির্দেশনামা শোনালেন তখন বিষণকুমারী দেবী আবার বর্ধমানের জমিদারী বাঁচাতে আগ্রহী হলেন। নিরুপায় তেজচন্দ্রও মাতা বিষণকুমারীর নামে জমিদারী বিক্রয় কোবালা লিখে দিলেন। সারা কালনা জুড়ে সাজ সাজ রব উঠলো। বর্ধমানের অস্থায়ী রাজধানী কালনাতে তখন আমলা সেনানায়করা, পুলিশের কর্তারা এবং ইংরেজ অফিসাররা আসতে থাকছেন। বিষণকুমারী মারা গেলেন ১৭৯৮ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর। কালনাতেই তাঁর শেষকৃত্য সমাপন হয়। জীবনের শেষ অধ্যায়ের ৪ বছর আবার তিনি বর্ধমান কে কোনোমতে বাঁচাতে পেরেছিলেন। কালনা থেকেই তিনি সব রাজস্বের হিসাব নিকাশ করে গেছেন। সৌভাগ্যের বিষয় মায়ের মৃত্যুর পর তেজচন্দ্র পালটে গেছিলেন । তবে মৃত্যুর আগে রাণী নয় বছরের পৌত্র প্রতাপচাঁদের নামে সকল সম্পত্তি ও জমিদারী উইল করে গেছিলেন, দেখভালের দায়িত্ব শুধু তেজচন্দ্রকে দিয়ে গেছিলেন। যাইহোক পরের পর্বে তেজচন্দ্র ভালোভাবে রাজত্ব চালান। এবং প্রতাপচাঁদের সময় বর্ধমান আবার বিচিত্র এক পরিস্থিতির সম্মুখিন হয়। এসময়ও কালনার একটা বড় ভূমিকা ছিল।
আবার আসি বিষণ কুমারী দেবীর কথায়।
মহারাজা তিলোকচাঁদের দ্বিতীয়া স্ত্রী ছিলেন বিষণ কুমারী। তিনি ছিলেন সেরগড় পরগনার উখরা নিবাসী মেহেরচাঁদ হাণ্ডের কন্যা এবং বক্তার সিংহ হাণ্ডের ভগ্নী। মেহেরচাঁদ হাণ্ডে লাহোর নগরের মচ্ছিহাট্টা মহল্লা থেকে উখরায় এসে বসবাস করেন। বিষণকুমারীর এক পুত্র তেজচাঁদ এবং কণ্যাদের বড় তোতাকুমারী ও ছোটো চিত্রকুমারী। লাহোর নিবাসী আনন্দচাঁদ শেঠের সঙ্গে তোতাকুমারী এবং দয়াচাঁদ শেঠের সঙ্গে চিত্রকুমারীর বিবাহ হয়। বিষণকুমারীর স্বামী তিলোকচাঁদ ১৭৪৪ থেকে ১৭৭০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত এই ২৬ বছর রাজত্বকালে যে সমস্ত সমস্যার মধ্যে পড়েছিলেন এবং সফলভাবে মোকাবিলা করেছিলেন তা খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন রাণী বিষণকুমারী। ফলে বিষণকুমারী যে সফল ভাবে রাজপাট চালিয়েছিলেন তার শিক্ষা এ সময়ই হয়ে গেছিল । বিষণকুমারী তাঁর জীবদ্দশায় তেজচাঁদকে সঠিক পথে আনতে ব্যর্থ হলেও মায়ের মৃত্যুর পর তেজচাঁদ পালটে যায়। শোনাযায় চারিদিকে দেনায় জর্জরিত হয়ে একের পর এক তালুক মহল্লা যখন হাতছাড়া হচ্ছে ঠিক সেসময় তেজচাঁদের চৈতন্যোদয় হয়। যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জেরে তেজচাঁদ জমিদারী খোয়াতে বসেছিলেন সেই নীতিই তাকে আবার বড়লোক করে দেয়। তিনি অনেকদিন আগেই তার বাবার চিন্তা মোতাবেক তাঁর অধিকারে থাকা পুরো এলাকাকে ছোটো ছোটো জমিদার সৃষ্টির মাধ্যমে ভাগ করে দেন। বাংলার বহু বিশিষ্ট ধনী ব্যক্তি সে সময় নিলামে সর্বোচ্চ সেলামি দিয়ে পত্তনি ব্যবস্থার মাধ্যমে জমিদারীর স্বাদ নিতে আসেন। ফলে একসাথে প্রচুর অর্থের আমদানীহল এবং তেজচাঁদ সহজেই গভর্ণমেন্টের প্রাপ্য খাজনা পরিশোধ করে দিতে পারলেন। ১৮৬০ সালে তিনি বিষ্ণুপুরের জমিদারী কিনে ফেলেন। ফলে ধনসম্পত্তিতে তিনি বাংলার সেরা রাজায় পরিণত হন। ১৮২৭ সালে তাঁর নির্মিত বর্ধমান কালনা সড়ক ব্যবসায় যেমন বর্ধমানকে উন্নত করেছিল তেমনি ১৮১০ সালে কালনাতে নবকৈলাস মন্দির (১০৮ শিব মন্দির) এবং গোলাপবাগ ও চিরিয়াখানা তৈরি করে সকলকে অবাক করে দিয়েছিলেন। ১৮৩২ সালে তেজচাঁদের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বাংলায় বর্ধমান রাজাদের বিপুল প্রতাপ সকলের সমীহ আদায় করেনিয়েছিল। তিলোেকচাঁদের পর থেকে যে রাজ পরিবার সমৃদ্ধশালী হতে থাকে, রাণী বিষণকুমারীর চেষ্টায় তা আরো বৃদ্ধিলাভ করে শেষে তেজচাঁদের হাতে শ্রেষ্ঠ সম্পদশালী অংশে পরিণত হয়। আজ সবই অতীত, কিছু মন্দির ও সৌধের মাধ্যমেই তাদের আমরা স্মরণে রেখেছি। তেজচাঁদের চিতাভষ্মের সমাধি একসময় কালনা মহিষমর্দিনী ইনস্টিটিউটে ছিল আজ তার হদিস দেওয়ার কেউ নেই,
বর্ধমান তখন একটি বর্ধিষ্ণু জমিদারী. রাজকোষ পরিপূর্ণ। এখবর ইষ্টইন্ডিয়া
কোম্পানীর ওপরমহলের কর্মচারীরা বিলক্ষণ জানেন। আবার এর দায়িত্বে একজন বিধবা রাজমাতা তাই যেনতেন প্রকারেন বর্ধমানের রাজকোষের ওপর দৃষ্টি পড়লো স্বয়ং ওয়ারেন হেস্টিংস এর। সে অবস্থায় বিষনকুমারী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে একদিকে রাজকোষ অন্যদিকে রাজ্যপাট ইংরেজদের ললুপ দৃষ্টি থেকে বাঁচান ।কিন্তু তারমধ্যেও ১১ লক্ষ টাকা ইংরেজ এবং তার সহযোগীরা আত্মসাৎ করে নেয়। ১৭৭৯ সাল পর্যন্ত বিষণকুমারী ঝড়ঝঞ্ঝা সহ্য করেও রাজ্যপাট টিকিয়ে রাখেন। পুত্র তেজচন্দ্র তখন ১৪ বছরের, তাঁর হাতে রাণীমা বিষণকুমারী বর্ধমানের রাজতন্ত্র সমর্পন করেন। অসাধারণ বুদ্ধিমতি এই রাণী রাজ্যের ৭৫ টি পরগণা থেকে বার্ষিক ৪০ থেকে ৪৩ লক্ষটাকা রাজস্ব আদায় করেছেন নিয়মিত। ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানীর কাছে বাকী থাকে নি কখনও। তাঁর আগ্রহেই কালনায় হয়েছে দুটি শিব মন্দির। একটি ১৭৬৪ সালে রূপেশ্বর শিবমন্দিরের পূর্ব দিকে, অন্যটি ১৭৮৪ সালে শ্রী শ্রী রামেশ্বর শিব মন্দির।
১৭৭৯ সালে মহারাজ তেজচন্দ্র রাজা হলেন বটে কিন্তু ছোটো থেকেই ছিলেন বিলাস প্রিয়, কুসংসর্গে থাকার কারণে আমোদ প্রমোদে বহু টাকা নয়ছয় করতে থাকেন। ১৭৮৩ খাজনা বাকী পড়লো ৩ লক্ষ ৩ হাজার ১৭৫ টাকা । ইংরেজ পরিচালিত বোর্ডও রাজাকে রাজকার্যে মনোযোগী হতে নির্দেশ করেন। ১৭৮৯ সালের মধ্যে তেজচন্দ্র ঠিকঠাক রাজস্ব দিতে না পারায় দুবার গৃহবন্দী হন এবং জরিমানাও দেন। একের পর এক অঞ্চল রাজার হাতছাড়া হতে থাকে। তবু উচ্ছৃঙ্খলতা রাজার কমলো না, ৮ জন পত্নী ছিল তেজচন্দ্রের এছাড়া একজন বিদেশীনী রক্ষিতাও ছিল তাঁর। রাণীমা বিষণ কুমারী ছেলের এই জীবনযাত্রায় খুবই বিরক্ত ছিলেন । ছেলে নাবালক থাকার সময় এই রাজত্বই তিনি যথেষ্ট দক্ষতার সাথেই চালিয়েছিলেন । তাই বেদনা সব থেকে তাঁরই হচ্ছিল। কিন্তু মায়ের পরামর্শ কানেও নিতেন না তেজচন্দ্র । বেশ কয়েকবার গণ্ডগোলও হয়। এদিকে ১৭৯৩ সালে রাজ্যের নিয়ম শাসন ভার কোম্পানীর নতুন পুলিশ আধিকারিকরা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় ফলে রাজা প্রকৃতপক্ষে সব ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত হলেন। ১৭৯৪ সালের ১০ই জানুয়ারী বর্ধমানের কালেক্টার সাহেব ঘোষণা করলেন একমাত্র রাণী বিষণকুমারী যদি দায়িত্ব নেন তবে রাজ্যপাট থাকবে নচেৎ পুরোটাই কেড়ে নেওয়া হবে। অবশ্য এর মধ্যে অনাদায়ী সব রাজস্ব পরিশোধ করতে হবে। শুধু তাই নয় তেজচন্দ্রকে বর্ধমানে না থাকারও নির্দেশ জারী হয়। এদিকে বিষণকুমারী ছেলের অত্যাচারে তখন কালনায় এসে থাকছেন। বাকী জীবনটা ধর্ম ও কৃষ্ণ সেবা করেই কাটাবেন একপ্রকার স্থিরও করেছিলেন । কিন্তু কালেক্টার সাহেব যখন স্বয়ং কালনায় এসে সরকারী নির্দেশনামা শোনালেন তখন বিষণকুমারী দেবী আবার বর্ধমানের জমিদারী বাঁচাতে আগ্রহী হলেন। নিরুপায় তেজচন্দ্রও মাতা বিষণকুমারীর নামে জমিদারী বিক্রয় কোবালা লিখে দিলেন। সারা কালনা জুড়ে সাজ সাজ রব উঠলো। বর্ধমানের অস্থায়ী রাজধানী কালনাতে তখন আমলা সেনানায়করা, পুলিশের কর্তারা এবং ইংরেজ অফিসাররা আসতে থাকছেন। বিষণকুমারী মারা গেলেন ১৭৯৮ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর। কালনাতেই তাঁর শেষকৃত্য সমাপন হয়। জীবনের শেষ অধ্যায়ের ৪ বছর আবার তিনি বর্ধমান কে কোনোমতে বাঁচাতে পেরেছিলেন। কালনা থেকেই তিনি সব রাজস্বের হিসাব নিকাশ করে গেছেন। সৌভাগ্যের বিষয় মায়ের মৃত্যুর পর তেজচন্দ্র পালটে গেছিলেন । তবে মৃত্যুর আগে রাণী নয় বছরের পৌত্র প্রতাপচাঁদের নামে সকল সম্পত্তি ও জমিদারী উইল করে গেছিলেন, দেখভালের দায়িত্ব শুধু তেজচন্দ্রকে দিয়ে গেছিলেন। যাইহোক পরের পর্বে তেজচন্দ্র ভালোভাবে রাজত্ব চালান। এবং প্রতাপচাঁদের সময় বর্ধমান আবার বিচিত্র এক পরিস্থিতির সম্মুখিন হয়। এসময়ও কালনার একটা বড় ভূমিকা ছিল।
আবার আসি বিষণ কুমারী দেবীর কথায়।
মহারাজা তিলোকচাঁদের দ্বিতীয়া স্ত্রী ছিলেন বিষণ কুমারী। তিনি ছিলেন সেরগড় পরগনার উখরা নিবাসী মেহেরচাঁদ হাণ্ডের কন্যা এবং বক্তার সিংহ হাণ্ডের ভগ্নী। মেহেরচাঁদ হাণ্ডে লাহোর নগরের মচ্ছিহাট্টা মহল্লা থেকে উখরায় এসে বসবাস করেন। বিষণকুমারীর এক পুত্র তেজচাঁদ এবং কণ্যাদের বড় তোতাকুমারী ও ছোটো চিত্রকুমারী। লাহোর নিবাসী আনন্দচাঁদ শেঠের সঙ্গে তোতাকুমারী এবং দয়াচাঁদ শেঠের সঙ্গে চিত্রকুমারীর বিবাহ হয়। বিষণকুমারীর স্বামী তিলোকচাঁদ ১৭৪৪ থেকে ১৭৭০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত এই ২৬ বছর রাজত্বকালে যে সমস্ত সমস্যার মধ্যে পড়েছিলেন এবং সফলভাবে মোকাবিলা করেছিলেন তা খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন রাণী বিষণকুমারী। ফলে বিষণকুমারী যে সফল ভাবে রাজপাট চালিয়েছিলেন তার শিক্ষা এ সময়ই হয়ে গেছিল । বিষণকুমারী তাঁর জীবদ্দশায় তেজচাঁদকে সঠিক পথে আনতে ব্যর্থ হলেও মায়ের মৃত্যুর পর তেজচাঁদ পালটে যায়। শোনাযায় চারিদিকে দেনায় জর্জরিত হয়ে একের পর এক তালুক মহল্লা যখন হাতছাড়া হচ্ছে ঠিক সেসময় তেজচাঁদের চৈতন্যোদয় হয়। যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জেরে তেজচাঁদ জমিদারী খোয়াতে বসেছিলেন সেই নীতিই তাকে আবার বড়লোক করে দেয়। তিনি অনেকদিন আগেই তার বাবার চিন্তা মোতাবেক তাঁর অধিকারে থাকা পুরো এলাকাকে ছোটো ছোটো জমিদার সৃষ্টির মাধ্যমে ভাগ করে দেন। বাংলার বহু বিশিষ্ট ধনী ব্যক্তি সে সময় নিলামে সর্বোচ্চ সেলামি দিয়ে পত্তনি ব্যবস্থার মাধ্যমে জমিদারীর স্বাদ নিতে আসেন। ফলে একসাথে প্রচুর অর্থের আমদানীহল এবং তেজচাঁদ সহজেই গভর্ণমেন্টের প্রাপ্য খাজনা পরিশোধ করে দিতে পারলেন। ১৮৬০ সালে তিনি বিষ্ণুপুরের জমিদারী কিনে ফেলেন। ফলে ধনসম্পত্তিতে তিনি বাংলার সেরা রাজায় পরিণত হন। ১৮২৭ সালে তাঁর নির্মিত বর্ধমান কালনা সড়ক ব্যবসায় যেমন বর্ধমানকে উন্নত করেছিল তেমনি ১৮১০ সালে কালনাতে নবকৈলাস মন্দির (১০৮ শিব মন্দির) এবং গোলাপবাগ ও চিরিয়াখানা তৈরি করে সকলকে অবাক করে দিয়েছিলেন। ১৮৩২ সালে তেজচাঁদের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বাংলায় বর্ধমান রাজাদের বিপুল প্রতাপ সকলের সমীহ আদায় করেনিয়েছিল। তিলোেকচাঁদের পর থেকে যে রাজ পরিবার সমৃদ্ধশালী হতে থাকে, রাণী বিষণকুমারীর চেষ্টায় তা আরো বৃদ্ধিলাভ করে শেষে তেজচাঁদের হাতে শ্রেষ্ঠ সম্পদশালী অংশে পরিণত হয়। আজ সবই অতীত, কিছু মন্দির ও সৌধের মাধ্যমেই তাদের আমরা স্মরণে রেখেছি। তেজচাঁদের চিতাভষ্মের সমাধি একসময় কালনা মহিষমর্দিনী ইনস্টিটিউটে ছিল আজ তার হদিস দেওয়ার কেউ নেই,
Author
অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় একজন সমকালীন বাংলা লেখক ও ইতিহাসচর্চাকারী। ইতিহাসভিত্তিক লেখা, গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ এবং সমাজ–সংস্কৃতির নানা দিক তাঁর লেখার মূল ক্ষেত্র। অতীতের ঘটনা ও চরিত্রকে তিনি বর্তমানের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করে সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় পাঠকের কাছে তুলে ধরেন। ইতিহাসচর্চার পাশাপাশি তাঁর নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা “ভাষাপথ (Vashapath)”-এর মাধ্যমে তিনি গবেষণামূলক ও গুণগত সাহিত্য প্রকাশে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। নতুন লেখক ও ইতিহাসমনস্ক পাঠকদের জন্য ভাষাপথ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তাঁর লেখায় তথ্যনিষ্ঠতা, বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভাষার শৈল্পিক প্রয়োগ একত্রে দেখা যায়। ইতিহাসকে কেবল অতীত হিসেবে নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সংযুক্ত একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করাই তাঁর লেখালেখির প্রধান উদ্দেশ্য।